অনেকেই জানেন ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার বেশি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন এই সুদ আসলে কীভাবে হিসাব করা হয়। ফলে অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না কেন তার বকেয়া এত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এই বিষয়টি বোঝার জন্য প্রথমে একটি ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। ক্রেডিট কার্ডের সুদ সাধারণত “বার্ষিক হার” হিসেবে দেখানো হয়, যাকে Annual Percentage Rate বা APR বলা হয়। ধরুন আপনার কার্ডের সুদের হার ৩৬ শতাংশ বছরে। এখন প্রশ্ন হলো, এই ৩৬ শতাংশ কি একবারে যোগ হয়? না। এটি আসলে প্রতিদিনের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। ধরি, আপনার বকেয়া আছে ১০,০০০ টাকা এবং আপনি পুরো বিল পরিশোধ করেননি। এখন ৩৬ শতাংশ বার্ষিক সুদকে দৈনিক হিসেবে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ ৩৬% ÷ ৩৬৫ ≈ প্রতিদিন প্রায় ০.০৯৮ শতাংশ। মানে প্রতিদিন আপনার ১০,০০০ টাকার উপর প্রায় ৯.৮ টাকা করে সুদ যোগ হচ্ছে। এখন অনেকেই এখানে ভুল করে ভাবে, “ঠিক আছে, প্রতিদিন তো খুব কমই যোগ হচ্ছে।” কিন্তু আসল বিষয়টা এখানে না। আসল বিষয় হলো “compounding” বা চক্রবৃদ্ধি সুদ। প্রথম দিনে আপনার সুদ যোগ হলো ৯.৮ টাকা, ফলে আপনার বকেয়া দাঁড়ালো ১০,০০৯.৮ টাকা। পরের দিন সুদ হিসাব হবে এই নতুন অংকের উপর। অর্থাৎ আবার ০.০৯৮ শতাংশ, কিন্তু এবার একটু বেশি টাকার উপর। এভাবে প্রতিদিন সুদ মূল টাকার সাথে যোগ হয়ে নতুন মূল তৈরি করে, এবং পরবর্তী দিনের সুদ সেই নতুন মূলের উপর হিসাব হয়। এই ধারণাটি বোঝাতে নিচের সূত্রটি কাজে লাগে: A = P{1+(r/n)}^nt এখানে, A = নির্দিষ্ট সময় পরে মোট বকেয়া P = মূল টাকা r = বার্ষিক সুদের হার n = বছরে কতবার সুদ যোগ হচ্ছে (ক্রেডিট কার্ডে প্রায় প্রতিদিন) t = সময় (বছরে) এখন সহজভাবে একটি বাস্তব উদাহরণ দেখি। ধরি, আপনি ১০,০০০ টাকা বকেয়া রেখেছেন এবং ৩ মাস কোনো পেমেন্ট করেননি। আপনি ভাবতে পারেন ৩ মাসে হয়তো ৯০০ টাকা সুদ হবে (৩৬% এর ৩ মাসের অংশ)। কিন্তু বাস্তবে এটি একটু বেশি হয়, কারণ প্রতিদিনের সুদ মূল টাকার সাথে যোগ হয়ে বাড়তে থাকে। ফলে ৩ মাস শেষে আপনার বকেয়া শুধু ১০,৯০০ টাকা হয় না, এর চেয়েও বেশি হতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে নতুন কেনাকাটার উপরও সুদ যোগ হতে শুরু করে যদি আপনার আগের বকেয়া থাকে। অর্থাৎ আপনি শুধু পুরনো ঋণের উপরই না, নতুন খরচের উপরও সুদ দিচ্ছেন। এখন বুঝতে হবে কেন শুধু মিনিমাম পেমেন্ট দিলে সমস্যা বাড়ে। আপনি যখন মিনিমাম পেমেন্ট দেন, তখন আপনার টাকার একটি অংশ সুদ মেটাতে চলে যায়, আর খুব অল্প অংশ মূল টাকায় কমে। ফলে বাকি টাকার উপর আবার সুদ যোগ হতে থাকে। এই চক্রটি যতদিন চলবে, আপনার ঋণ তত ধীরে কমবে। স্মার্ট ব্যবহারকারীরা এই অংকটি মাথায় রাখে। তারা জানে, সুদ প্রতিদিন যোগ হচ্ছে, তাই যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া শূন্যে নামানোই সবচেয়ে ভালো কৌশল। যদি পুরো টাকা একসাথে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত বড় অংকের পেমেন্ট করা উচিত, যাতে মূল টাকাটি দ্রুত কমে এবং পরবর্তী সুদের পরিমাণও কমে যায়। শেষ পর্যন্ত, ক্রেডিট কার্ডের সুদ কোনো রহস্যময় বিষয় নয়। এটি একটি গাণিতিক প্রক্রিয়া, যা প্রতিদিন আপনার বিরুদ্ধে কাজ করে—যদি আপনি এটিকে নিয়ন্ত্রণে না রাখেন। প্রশ্ন হলো, আপনি কি এই অংকটি বুঝে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি অজান্তেই চক্রবৃদ্ধি সুদের মধ্যে আটকে যাচ্ছেন?